সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন

এইচএসসিতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ মিললেও বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত

একুশের কণ্ঠ প্রতিবেদন:: চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা ডিসেম্বরেই ফের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পরীক্ষা শেষে ওই মাসেই তাদের ফল প্রকাশ করা হবে। এর আগে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হবে। গতকাল রোববার থেকেই পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন নেওয়া শুরু করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। ডিসেম্বরে পুনঃপরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হলেও অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন না।

কারণ এর আগেই এসব প্রতিষ্ঠানের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে। এদিকে এইচএসসি পরীক্ষায় যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য কিংবা আশঙ্কাজনকভাবে কম, সেগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ বিষয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত শনিবার এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এবার মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯৭৮ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ শিক্ষার্থী। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে সর্বশেষ ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এ ছাড়া, গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৭৬ জন। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে। গতবারের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ কমেছে ৩২ হাজার ৯২ জন।

ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এবার ফেল করা ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। এদের মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন। আর দুই বিষয়ে ফেল করেছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন। এ এক-দুই বিষয়ের মধ্যে ইংরেজি, আইসিটি ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। ইংরেজি বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ফেল করেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় হিসেবে ইংরেজিতে পাসের হার ৬১.১৪ শতাংশ, আইসিটিতে পাসের হার ৭১.৫৩ এবং হিসাববিজ্ঞানে পাসের হার ৬৫.৭৪ শতাংশ।

এ ছাড়া, বিভাগভিত্তিক হিসেবে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করলেও বরাবরের মতো মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীরা খুব একটা ভালো ফল করতে পারেননি। এবার মানবিকে পাসের হার ৪২.১৭ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫০.৭৭ এবং বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার ৭৩.১২ শতাংশ।

ইংরেজি, আইসিটি ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগে এত শিক্ষার্থী ফেল করার কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও দক্ষ শিক্ষক ঘাটতি, আইসিটির ক্লাস ঠিকমতো না হাওয়া এবং মনিটরিংয়ের অভাবকেই দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের ভাষ্যমতে, ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকট ও দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। মূল্যায়ন শুধু পাস-ফেলের হিসাব নয়; বরং শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন, দুর্বলতা ও উন্নতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। বর্তমান ফল বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে শিক্ষক স্বল্পতা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিখন ঘাটতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আইসিটি ল্যাবের অভাব, দক্ষ শিক্ষকের সংকট এবং বারবার অপরিকল্পিত কারিকুলাম পরিবর্তন। পাশাপাশি সুস্পষ্ট শিক্ষানীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবও শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কার।

দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ফল ডিসেম্বরে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের আবার পরীক্ষায় বসতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই পরীক্ষা নিয়ে একই মাসে ফল প্রকাশের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাতে এ বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের চলতি শিক্ষাবর্ষেই উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহেই এই পরীক্ষার রুটিন ও ফরম পূরণের সময়সূচি ঘোষণা করা হবে। আর পরীক্ষার্থী কম থাকায় উপজেলা পর্যায়ে একটি কেন্দ্রে পরীক্ষা হতে পারে।

বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরের বছর আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়গুলো অথবা ইচ্ছা করলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। নতুন উদ্যোগ কার্যকর হলে এ অপেক্ষা কমবে। পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, যারা দুই বিষয়ে ফেল করেছে তারা যদি কঠিন প্রস্তুতি নেয় তাহলে তারাও উত্তীর্ণ হতে পারবে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, পরীক্ষার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। ডিসেম্বরের শুরুতে পরীক্ষা নিয়ে ওই মাসেই ফল প্রকাশ করা হবে।

পুনঃপরীক্ষার আগেই খাতা পুনর্নিরীক্ষণের ফল এই পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের আবেদন শুরু হয়েছে গত শনিবার। আগ্রহী পরীক্ষার্থীরা আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে উত্তরপত্র যাচাই ও নম্বর সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়া শেষে আগামী ২৭ নভেম্বর ফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে শিক্ষা বোর্ডের।

পরীক্ষা ও ফল হলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন না শিক্ষার্থীরা ডিসেম্বরে পুনরায় পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ করা হলেও অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন না। এ নিয়ে মনঃক্ষুণ্ণ শিক্ষার্থীরা। তথ্যমতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তিতে অনলাইনে আবেদনের কার্যক্রম আগামী ১১ নভেম্বর দুপুর ১২টায় শুরু হবে। এ কার্যক্রম ২৫ নভেম্বর ২০২৬ রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত চলবে। ৫ ডিসেম্বর থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রাথমিক আবেদন আগামী ১২ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। আগামী বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে ভর্তি পরীক্ষা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে আগামী বছরের ২৯ জানুয়ারি। পরীক্ষায় অংশ নিতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন চলবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে আগামী বছরের ১০ জানুয়ারি। তবে কবে থেকে ভর্তির আবেদন গ্রহণ শুরু হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ফলে পুনরায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও বড় এই চার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন না শিক্ষার্থীরা। তবে সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (জিএসটি) গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ভর্তির সুযোগ থাকবে তাদের জন্য। কারণ বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা শেষে এসব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়।

একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেবল প্রস্তুতির অভাবেই শিক্ষার্থীরা ফেল করেন না; বরং নানা পারিপার্শ্বিক কারণেও অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফেল করা শিক্ষার্থীরাও খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পর জিপিএ-৫ অর্জন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে এক বা দুই বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেক শিক্ষার্থীই ভালো ফল করতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু তাদের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ না পাওয়ায় হতাশা ও আক্ষেপ থাকতে পারে।

২০২৫ সালের এইচএসসির খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পর নতুন ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। একইসঙ্গে ফেল থেকে পাস করেছেন ৪ হাজার ৫৮৫ জন। খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পর নম্বর পরিবর্তন হয়েছে ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের। আর জিপিএ বা গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের।

তবে শিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাদের উত্তরপত্র দেখায় পরীক্ষকের গরমিলের কারণে ফল খারাপ এসেছে তাদের খাতা পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের সময় ঠিক হয়ে যাবে। তারা বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পাবেন।

তারা আরও বলেন, পুনর্নিরীক্ষণ করে মূলত প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা দেখা হয়। আর পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করলে খাতা নতুন করে দেখা হয়। ফলে আসলেই যারা অকৃতকার্য হয়েছেন তাদেরই পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হবে। তবে পুনরায় পরীক্ষার আগে অনেক প্রস্তুতি নিতে হয়। ফেল করা শিক্ষার্থীদের আগে এক বছর অপেক্ষা করতে হতো, এবার তা লাগছে না। এই শিক্ষা বর্ষের অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন তারা।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, পুনরায় পরীক্ষা আর মূল পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি একই। কারণ নতুন করে প্রশ্ন ছাপাতে হবে, পরীক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, কেন্দ্র ঠিক করতে হবে। তাই এত কম সময়ে এই পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা সবকিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করেই ডিসেম্বরে পরীক্ষা ও ফল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com